ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রবাসী বাংলাদেশির শেষ ইচ্ছা পূরণ করলো সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকেরা

|| ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন প্রবাসী বাংলাদেশির শেষ ইচ্ছা পূরণ করে,মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করলেন সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ||

রানা শিকদার,বয়স ৩২ বছর।একজন প্রবাসি কর্মী,একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা।বাড়ি নারায়ণগঞ্জে।সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে ২০০৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই চলে যান সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে খেয়ে না খেয়ে পরিবার ও দেশের জন্য টাকা পাঠান।

মে মাসের শুরুর দিকে হঠাৎ রানার পেটে ব্যথা আর বমি শুরু হয়।পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেল তার পাকস্থলীতে ক্যানসার। চিকিৎসকেরা জানালেন, একেবারে শেষ পর্যায়ে ক্যানসার,তাদের আর কিছু করার নেই।

রানা বলেন,”মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।সঙ্গে সঙ্গে মা আর ছেলের মুখটা ভেসে উঠল মনে’। ডাক্তারদের বললাম, যেহেতু বাঁচব না,তাই জীবনের শেষ কটা দিন পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চাই। কিন্তু, ততদিনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। বিমান চলাচল বন্ধ। ভেবেছিলাম, জীবনে হয়তো আর কোনো দিনই ছেলের মুখটা দেখতে পাব না। সারাক্ষণ কান্না করতাম”।

সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের চিকিৎসক সিনথিয়া গুহ হঠাৎ রানার জীবনের গল্প শুনলেন।বললেন,‘দেখি কী করা যায়।’ সিনথিয়া বলেন,‘রানার শেষ ইচ্ছাটা (দেশে ফেরা) আমি জানতে পারি ১৫ মে। এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করতে বললেন।যোগাযোগ করি,কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাইনি।এক পর্যায়ে হাসপাতালের একজন নার্স প্রস্তাব করেন, আমরা ক্রাউডসোর্সিংয়ের মাধ্যমে রানার জন্য ফান্ড তৈরি করতে পারি।

তার দল তখন রানাকে বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য সব ধরণের প্রচেষ্টা শুরু করে।

সিনথিয়া বলেন,”১০ জুনের আগে স্বাভাবিক ফ্লাইট চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে।আমি দ্রুত একটা মেডিকেল ইভাকুয়েশন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা জানায়, যদি সিঙ্গাপুরের স্থানীয় কেউ দায়িত্ব নেয়, তবে তারা রোগী ঢাকায় পৌঁছে দেবে। টাকা পরে দিলেও হবে। এরপর দ্রুত যোগাযোগ করি সিঙ্গাপুরের মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টারে। তারা অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। আমরা ক্রাউডসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ফান্ড জোগাড়ের পুরো ব্যাপারটা তাদের বুঝিয়ে দেই”।

ডা.সিনথিয়া জানান,”যখন সব মোটামুটি গুছিয়ে আনা হচ্ছে,তখন বাংলাদেশ হাইকমিশন রানার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলল।তহবিল ছাড়াও,
বাংলাদেশ হাই কমিশন রানা যে বাংলাদেশী তার প্রমাণ হিসাবে চাইলে সমস্যা দেখা দেয়।”

সিনথিয়া বাংলাদেশে রানার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাইকমিশনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন।এরপর হাইকমিশন বলল,করোনা পরীক্ষার ফলাফলও জমা দিতে হবে।তাও দেওয়া হয়।এর পর এক শুক্রবার বাংলাদেশ হাইকমিশন জানায়,রানাকে বাংলাদেশের কোন হাসপাতাল গ্রহণ করবে তা তাদের জানাতে এবং ওই হাসপাতালের একটা চিঠি হাইকমিশনে পাঠাতে।

সিনথিয়িা বলেন,”সৌভাগ্যবশত, আমি বাংলাদেশে প্রায় ছয় বছরের মতো ক্যানসারের ওপর কাজ করেছি। তাই সেখানে আমার পরিচিত ডাক্তারদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালযয়ে (বিএসএমএমইউ) যোগাযোগ করি। তারা রানাকে গ্রহণ করতে রাজি হয় এবং একটা চিঠিও পাঠায়।”

ডা.সিনথিয়া বলেন,”হাইকমিশনে ওই চিঠি জমা দেওয়ার পর তারা জানায়, বিশেষ বিমান অবতরণের জন্য সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগবে। আবার বাংলাদেশে যোগাযোগ করে অনুমতি জোগাড় করি। সবশেষে ২২ মে রাতে আমরা রানাকে তার জন্মভূমিতে,পরিবারের কাছে পাঠাতে সক্ষম হই।”

অবশেষে গত ২২ মে মধ্যরাতে প্রাইভেট বিমান চার্টার্ড এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে রানাকে পৌঁছে দেন বাংলাদেশে। তার সাথে এসেছেন হাসপাতালটির দু’জন ডাক্তারও।

রানাকে বিশেষ বিমানে বাংলাদেশে পাঠাতে খরচ হয় ৪৮ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার বা ৩১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। আর রানার জন্য ডা. সিনথিয়ারা যে তহবিল গঠন করেছিলেন মাত্র ৭২ ঘণ্টায় তাতে জমা পড়ে ৬০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার বা ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বাকি টাকা খরচ হবে রানার পরিবারের কল্যানে।

বিএসএমএমইউ হাসপাতালের অনুমতি নিয়ে ২৩ মে দুপুরে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাড়িতে চলে যান রানা শিকদার। আছেন পরিবারের সান্নিধ্যে।

কেন এতটা ঝামেলা নিলেন— জানতে চাইলে সিনথিয়া বলেন,”রানার চাওয়া তো খুব বেশি কিছু না।শুধু জীবনের শেষ কয়টাদিন পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চেয়েছেন তিনি। মানুষ হিসেবে যদি এইটুকু না করতে পারতাম,তবে নিজেকে অপরাধী মনে হতো।”

আবেগাপ্লুত রানা বলেন,”আমার কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর কোনো ভাষা নেই,” তিনি নিশ্চিত সিনথিয়া গুহ এবং তার দলটি মানুষ ছিলেন না।
“তারা ফেরেশতা।”

সীমাহীন কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ভালবাসা রইলো সিনথিয়া গুহ এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্যে।দোয়া করুন অসুস্থ রানা শিকদারের জন্যে।
পরিশেষে বলতে চাই,যত প্রতিকুলতাই আসুক
সর্বদাই জয় হোক মানবতার,জয় হোক উদার হৃদয়ের।

~Sayma Akhter

Reference : thedailystar.net

পোস্টটি পছন্দ হলে সরাসরি শেয়ার করুন।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.