
আহলান সাহলান সু-স্বাগতম পবিত্র মাহে রমজানুল মোবারক। শুরু হওয়া রমজান মাস হলো ইবাদতের বসন্তকাল। এ মাসে প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে বয়ে আনে জান্নাতি সুবাস। এ মাসে মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা প্রতি মুহূর্তে দিনে-রাতে মুমিনদের উপর অবারিত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করেন।
ইবাদতপাগল মুমিনদের জন্য মাগফিরাত ও জান্নাতের সকল আয়োজন প্রস্তুত রেখেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা।
রমজান শব্দটি আরবি ‘রমজুন’ শব্দ থেকে উৎগত হয়েছে। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া, ভষ্মীভুত হওয়া ইত্যাদি। যেহেতু রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষের মনের ক্রোধ, কু-প্রবৃত্তি, হিংসা-বিদ্বেষ সব কিছু ভষ্মীভুত হয়ে যায়, তাই রোজার এ সিয়াম সাধনার মাসকে রমজান মাস বলা হয়।
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে রমজান মাসব্যাপী রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানাপিনা ও জৈন কামনা বাসনাসহ বৈধ জৈবিক চাহিদাও পূরণ থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম সাধনা বা রোজা। আল্লাহ তায়ালা কোন মাসকে অন্য মাসের উপর, কোন দিবসকে অন্য দিবসের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন। এরকমই পবিত্র রমজানুল মোবারক হলো শ্রেষ্ঠ মাসের অন্যতম একটি মাস। এর প্রতি মুহূর্তে ইবাদত পাগল মুমিনদের উপর বর্ষিত হয় রহমতের বারিধারা। এজন্যই বহুগুন আমলের সওয়াব বেড়ে যায়। হাদিসে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এরশাদ ফরমান, রমজানে আসমানের বরকতের দরজা খুলে যায়, জান্নাতের সব দুয়ার খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়। মরদুদ শয়তান শৃঙ্খলিত হয়।
আল্লাহর বান্দদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহান মুক্তি বার্তা নিয়ে ধাবমান হয় রমজান। এতে রয়েছে শবে কদরের রজনী, যা হাজারো মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এসব নানাবিধ মর্যাদা বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব সমাহার মাহে রমজান। তাই তো রমজান মাসকে ইবাদতের বসন্তকাল বলা হয়ে থাকে। ইবাদত, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উর্বর সময়। এ উর্বর সময়ে বান্দা যথাযথভাবে নিষ্ঠার সাথে কাজে লাগাতে পারলে একটুখানি সাধনা, ক্ষুদ্র পরিশীলন এবং অনুশীলন এ-র মাধ্যমে প্রশান্তির বারিধারায় সিক্ত হয়ে হাসিল করতে পারেন আল্লাহ তায়ালা’র মহাসন্তুষ্টি। তথা দুনিয়ায় কল্যাণ ও আখেরাতে মহামুক্তি।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম একটি স্তম্ভ। রোজার বিধান ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার’।
হযরত কা’ব ইবনে উজরা (রা.) হতে বর্নিত, তিনি বলেন- একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বরের নিকট সমবেত হও। আমরা সকলেই তথায় উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম সিড়িঁতে পা রাখলেন,তখন বললেন, আমীন, যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন, যখন তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন। হযরত কা’ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) অবতরণ করলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজ (মিম্বরে উঠার সময়) আমরা আপনাকে এমন কিছু কথা বলতে শুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিবরাইল (আ.) আমার নিকট আগমন করেছিলেন, যখন আমি প্রথম সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমজান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ করাতে পারলো না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করলো না। আমি বললাম আমীন। যখন তৃতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল আর তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতী করতে পারলো না। আমি বললাম, আমীন।
হযরত আবু হুরয়রা (রা.) বলেন, রমজান মাস লাভকারী ব্যক্তি যে উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম (রোজা, তারাবী ও অন্যান্য আমল) পালন করে, তার প্রথম পুরস্কার এই যে, সে গুনাহ থেকে ঐ দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল।
হযরত সালমান ফারসী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, মহানবী (সা:) শা’বান মাসের শেষ দিন আমাদেরকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা মনযোগ দিয়ে শোনে রাখ, তোমাদের সামনে এমন একটি মাস সমাগত। যে মাস মহা পবিত্র, রহমত-বরকত ও নাজাতে ভরপুর। এই মাসের রোজাকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন। যে লোক এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন।
হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা রমজান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রাত্রিতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দুআ কবুল করেন।
রমজান আমাদেরকে আল্লাহর রহমত লাভের সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। এই দশকে আমরা বেশি বেশি করে ইবাদত-বন্দেগী, কুরআন তেলাওয়াত, দান সদকা, তওবা, ইস্তেগফার ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পবিত্র এই মাসের যথাযথ হক আদায় করে রোজা, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, তেলাওয়াত সহ অন্যান্য নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দিন।
নেফাকি বদচরিত্র- মিথ্যা, ওয়াদা খেলাপী, আমানতের খিয়ানত, অশ্লীলতা/অশ্লীল কথা বলা ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে পরিপূর্ণ মুমিনের গুণাবলী অর্জন করার মাধ্যমে আগামীর সুন্দর একেক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনের তৌফিক দিন। কায়মনোবাক্যে মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট করি সেই মিনতি।
লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

রমজানের লেখনী প্রকাশ করায় সম্পাদকসহ কতৃপক্ষকে নিরন্তর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
LikeLiked by 1 person
আপ্নাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
আপ্নার কাছ থেকে আমরা এরকম সুন্দর লেখা আরো বেশি আশা করি।
যাতে আমাদের ভাইবোনেরা কিছুটা হলেও শিখতে বা জানতে পারে লেখা থেকে।
LikeLike