ঝরা পাতার কাব্য

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন— ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে/ অনেক হাসি অনেক অশ্রুজলে/ ফাগুন দিল বিদায়মন্ত্র আমার হিয়াতলে\’

ঠিক তাই মনে হলো সিলেটে টিলাগড় ইকোপার্কে ঘুরতে এসে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের জন্যই অপেক্ষা করে আছে টিলাগড় ইকোপার্ক। পার্কে ঢুকেই পেলাম সুনসান নীরবতা, দূরে কোথাও অপরিচিত পাখির ডাক, গহীন বনে দীর্ঘ শালগাছের মগডালে দুষ্টু কাঠঠোকরা পাখিটি তার লম্বা চঞ্চু দিয়ে গাছের ডালে অবিরাম আঘাত করে চলছে। হঠাৎ আগমন টের পেয়ে পাখিটি পালকের ঝাপটায় নীরবতা ভেঙে দিয়ে হারিয়ে গেল টিলাগড় ইকোপার্কের গহীনে। আর ঝরা পাতাগুলো রাস্তাকে সাজিয়ে রেখেছে তার বেদনায়। বনবিড়াল আর ঘুঘু সতর্ক পা ফেলে নিরাপদ দূরত্বে এদিক-সেদিক করছিল। মাতাল করা বাতাসের হিল্লোলে বৃক্ষরাজির সবুজ পাতা আনন্দে যখন-তখন নেচে ওঠে। একই অবস্থা এখানকার নানা প্রজাতির জীবজন্তু ও সরীসৃপ প্রাণীগুলোরও। দেখা মিলল টিলাতে উঠার জন্য সিঁড়ির, গুনে গুনে প্রায় শতাধিক ধাপের সিঁড়ি। পথিমধ্যে বনফুল আপনাকে স্বাগত জানাবে। কথা হচ্ছিল জাকির ভাইয়ের সঙ্গে, তিনি জানালেন ইকোপার্কে ঢুকলে প্রথমেই যে প্রাণীটির দেখা মিলবে, সেটি হচ্ছে বিরল প্রজাতির বানর। সবচেয়ে বেশি বানরের দেখা মেলে দুপুর ১২টার দিকে। মাঝে মধ্যেই দেখা মিলতে পারে চিতা বাঘ, গন্ধগোকুল, বনমোরগসহ বিরল প্রজাতির অনেক প্রাণীর। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এখানে প্রায় ১৫০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। ঢোঁড়া, বোড়া, আলোদ, অজগরসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। সেগুন, শাল, গর্জন, চাপালিশ, একাশিয়াসহ প্রায় ২০-২৫ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। বনের অর্ধেক অংশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বেত গাছ। তবে পার্কটি বৃক্ষপ্রেমিক আর দর্শনার্থীদের প্রিয় স্থান। শত ব্যস্ততার মধ্যে দুই দণ্ড শান্তির জন্য নির্জন প্রকৃতির কোলে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যেতে পারলে মন্দ হয় না। যারা সিলেটে আসেন, তাদের জন্য খুব কাছের দূরত্ব। সিলেটে এমসি কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পাড়ি দিয়ে বন, পাহাড়, টিলাঘেরা স্থানে টিলাগড় ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নগরীর উত্তর-পূর্ব কোণে শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ১১২ একর বন নিয়ে টিলাগড় এলাকায় দেশের তৃতীয় ইকোপার্কটি স্থাপিত হলে এর নামকরণ করা হয় ‘টিলাগড় ইকোপার্ক’। বৃক্ষপ্রেমীদের জন্য পার্কটি আকর্ষণীয়। টিলাগড় ইকোপার্কটি কয়েকটি ছোট ছোট টিলা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। এটি সিলেট বন বিভাগ, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ইকোপার্ক প্রকল্প। এখানে রয়েছে একটি শিশুপার্ক, দর্শনার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি বসার স্থান।

পথের ঠিকানা—ঢাকা থেকে ট্রেন/বাসযোগে সিলেট ভাড়া ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। স্টেশন থেকে সরাসরি যেতে পারবেন অথবা সিলেট শহরের বন্দর বাজার থেকে টিলাগড় ইকোপার্কে যেতে সময় লাগবে ৩০ মিনিটের মতো। সিএনজিচালিত অটোরিকশা অথবা মাইক্রোবাস ভাড়া করলে নেবে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। চাইলে রিকশা করেও যেতে পারবেন কিন্তু সময় লাগবে বেশি। তবে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করতে হলে রিকশা করে গেলে মন্দ হয় না।

ছবি: লেখক

সুমন্ত গুপ্ত, এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.