
অফিসের সহকর্মী মনির ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল নতুন কোথায় যাওয়া যায় ঘুরতে তা নিয়ে। তিনি জানতে চাইলেন, ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের গোলাপ গ্রামে গিয়েছেন নাকি। আমি বললাম, নাম শুনেছি কিন্তু যাওয়া হয়নি। মনির ভাই বললেন, আমার বাড়ি থেকে গন্তব্যে যেতে খুব বেশি হলে ২৫ মিনিট লাগবে। ভ্রমণের দিন সূর্যের প্রখরতা বাড়ার আগেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। আমরা মানে আমি আর আমার অর্ধাঙ্গী সানন্দা। তিন চাকার মানবগাড়িতে করে আমরা পৌঁছলাম গুলিস্তানে। মানবগাড়ি থেকে নামতেই একজন বললেন, এই বাস একটু পরই গন্তব্যে যাত্রা করবে, তাই বাসে উঠে পড়তে। আমি ভাবলাম, আগে আগে পৌঁছতে পারলেই ভালো হয়, তাহলে ভালোভাবে ঘুরে দেখে আসতে পারব। সেখান থেকে উঠে পড়লাম বাসে। বেশকিছু সময় পেরিয়ে গেল, গাড়ি তো ছাড়ার নাম নেই। এদিকে একটু পর পর মানুষ ডেকে ডেকে ওঠাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের বাস ছাড়ল প্রায় ১ ঘণ্টা বিলম্বে। এদিকে মনির ভাইয়ের ফোন—কোথায় ভাই আপনারা। আমি বললাম, বাস ছেড়েছে মাত্র, আসছি। আমরা চলছি মহাসড়ক ধরে। মাঝে মধ্যে রাস্তায় জ্যাম যাত্রাপথকে দীর্ঘায়িত করছে। প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টার মধ্যে আমরা এসে পৌঁছলাম সাভার বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে আগের থেকেই অপেক্ষা করছিলেন মনির ভাই। দেখা হতেই মনির ভাই বললেন, আগে চলেন আমার বাসার দিকে যাই, সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে গন্তব্যে বেরিয়ে পড়ব। আমি বললাম, না আগে ঘুরে আসি, পরে আপনার বাসায় যাব। তাই কালবিলম্ব না করে আমরা উঠে পড়লাম তিন চাকার ইঞ্জিন গাড়িতে। ছুটে চলছে আমাদের তিন চাকার যান্ত্রিক বাহন। ভাঙা সড়কে দোল খেতে খেতে কিছুটা পথ এগোতেই নৈসর্গিক সব দৃশ্যে চোখ আটকাল। সত্যিই অসাধারণ, ঢাকার পাশেই এমন মায়াবী প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। সোঁদা মাটির গন্ধ নাকে পেতে পেতেই চোখে ধরা পড়ল লাল গোলাপের বিশাল বাগান। সানন্দা দেখে তো বেজায় খুশি। মনির ভাই বললেন, আরেকটু সামনে গিয়ে নামি, তখন শেষ মাথা থেকে ঘুরে ঘুরে দেখে আসতে পারব। গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সরু পথ। পথের ধারঘেঁষে অসংখ্য গোলাপের বাগান। যত দূর চোখ যায়, শুধু লাল গোলাপের সমারোহ। মাঝে মধ্যে কিছু সাদা গোলাপ, গ্লাডিওলাস, জারবেরার বাগানও চোখে পড়ে। সূর্যদেবের রক্তিম আভার সঙ্গে লাল টকটকে গোলাপ মাথা উঁচিয়ে থাকে। দুপুরের পর থেকেই চাষীরা বাগানে নেমে যান গোলাপ তুলতে। গাছের সারির একপাশ থেকে ফুল তোলা শুরু করে শেষ পর্যন্ত মুঠো ভরে ফুল তোলেন। চাষীদের ফুল তোলার দৃশ্যও বেশ উপভোগ্য। মনির ভাই বললেন, বাণিজ্যিকভাবে এখানে প্রথম গোলাপ চাষ শুরু হয় ১৯৯০ সালে। কয়েকজন যুবক এ গোলাপ চাষ শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভালো ফলন ও ভালো মুনাফা হওয়ায় এখন সাদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া গ্রামের মানুষ গোলাপ চাষ করে অনেকেই স্বনির্ভর। বর্তমানে গোলাপ পুরো ইউনিয়নেই চাষাবাদ হচ্ছে। সাদুল্লাহপুর গ্রামের মানুষ স্বল্প সময়ে বেশি মুনাফার আশায় মূল পেশা পরিবর্তন করেছে। তারা কৃষিকাজ ছেড়ে এখন সবাই গোলাপ চাষে ব্যস্ত। সাদুল্লাহপুর গ্রামসংলগ্ন শ্যামপুর, মোস্তাপাড়া রানীপাড়া গ্রামের চিত্র একই। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি, গোলাপ বাগানের ভেতরে ছবিও তুললাম। এবার গেলাম গোলাপের হাটে বছরের বারো মাসই গোলাপ চাষ হয়। ভর সন্ধ্যায় ফুল বিক্রির বাজার বসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসেন গোলাপ কিনতে। এখন সন্ধ্যা হতে মেলা বাকি, তার পরও হাটে আসতে শুরু করেছে ফুল। আমি এক আঁটি ফুল কিনি সানন্দার জন্য, ফুল পেয়ে সানন্দা মহাখুশি। এবার গেলাম মনির ভাইয়ের বাসায়, সেখানে পেট পূজা শেষ করে ফিরে চললাম শহর পানে।
কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে উত্তরা থার্ড ফেস, মিরপুর বেড়িবাঁধ ও গাবতলী হয়ে সাভার উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নের উত্তর শ্যামপুর গ্রামে সরাসরি নিজস্ব বা ভাড়া গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। এছাড়া সাভার বাজারস্ট্যান্ড থেকে বাসে বা লেগুনায় যাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে কয়েকবার যানবাহন বদল করতে হবে। আর উত্তরা বা বেড়িবাঁধ দিয়েও নিজস্ব গাড়ি ছাড়া যেতে চাইলে কয়েক দফা গাড়ি বদল করে বিরুলিয়া ব্রিজ দিয়ে চলে যেতে পারেন।
