টাকার লোভে ১১বছরের মেয়েকে হত্যার অনুমতি দেন বাবা।।

সিআইডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের সময় আসামিদের সামনে আনা হয়। ইনসেটে মেয়ের ছবি।

প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা চলছিল। দরকার একটি লাশ। এরই বলি হয় নরসিংদীর বাহের চর এলাকার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু ইলমা বেগম (১১)। শিশুটির বাবা ৩০ লাখ টাকায় একটি পক্ষের সঙ্গে চুক্তি করেন মেয়েকে হত্যার জন্য। নির্মম ওই ঘটনা জানতেন শিশুটির মা। এজন্য তারা চার লাখ টাকাও পেয়েছিলেন। পুরো হত্যার নেতৃত্ব দেন শিশুটির ফুফাতো ভাই।

২০১৫ সালের মার্চে ওই হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছরের মাথায় সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ ওই নৃশংসতার রহস্য উদ্ঘাটন করে।

নরসিংদীর মাধবদী থেকে ইলমার বাবা আবদুল মোতালিব, মা মঙ্গলী বেগম, ফুপাত ভাই মাসুম মিয়া, শাহজাহান ভূঁইয়া ও মো. বাতেন নামে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করলে এই রহস্য বেরিয়ে আসে। এরইমধ্যে মাসুম মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সোমবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে ইলমা হত্যা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সিআইডি কর্মকর্তারা। সেখানে সংস্থাটির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ইলমা তার বাবার লোভের বলি হয়েছিল। নরসিংদীর বাহের চরে স্থানীয় শাহজাহান ভূঁইয়া ও সাবেক মেম্বার বাচ্চুর নেতৃত্বে দুটি দলের প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিবাদ চলে আসছিল। শাহজাহান ভূঁইয়ার লোকজন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে শিশু হত্যার পরিকল্পনা করে। এর বিনিময়ে তিনি ইলমার বাবা আবদুল মোতালেবকে ৩০ লাখ টাকা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। টাকার লোভে ইলমার বাবা মেয়েকে হত্যার অনুমতি দেয়।

সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, শিশু ইলমা হত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া মাসুম মিয়া জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। সে জানায়, ইলমাকে হত্যার পরিকল্পনা হয় ২০১৫ সালের ১ মার্চ। ওই রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১৩ জন উপস্থিত ছিল। সিদ্ধান্ত অনুসারে ইলমার বাবাকে সন্তানের বিনিময়ে ৩০ লাখ টাকার টোপ দেওয়া হয়। তাতেই রাজি হয়ে যান তিনি। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ইলমার দুলাভাই বাবুল বাড়ির পাশে নূরার দোকান থেকে ইলমাকে জিনিসপত্র কিনতে পাঠান। বাড়ি ফেরার পথে দুলাভাই বাবুল ও ফুপাতো ভাই মাসুমের নেতৃত্বে সাত-আট জন শিশুটিকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ইট ও মুগুর দিয়ে মাথা থেঁতলে ও গলাটিপে তাকে হত্যা করা হয়।

মাসুম মিয়া দাবি করেছে, ওই সময়ে ইলমার বাবা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইলমার বাবা মোতালিব মূল আসামিদের বাদ দিয়ে বিরোধী পক্ষ বাচ্চু গ্রুপের বিলকিস, খোরশেদ, নাসুসহ অজ্ঞাত চার-পাঁচ জনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের আগে ইলমার বাবাকে চার লাখ টাকা দেওয়া হলেও পরে আর তাকে টাকা দেওয়া হয়নি।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ইলমার বাবার সঙ্গে চুক্তি ছিল হত্যার আগে তিনি সব টাকা পাবেন। কিন্তু মেয়েকে হত্যার প্রস্তুতির সময়ে তাকে মাত্র চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। ওই সময়ে তিনি মূল খুনি তার ভাগ্নে মাসুম মিয়ার উদ্দেশ্যে বলতে থাকে ‘আগে টাকা দাও পরে কাম সারো’। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি আর সব টাকা পাননি। জেলে যাওয়ার ভয়ে পুলিশের কাছেও মুখ খোলেননি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয় একজন আসামির স্বীকারোক্তিতেই শিশুটির বাবা-মায়ের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় কি না? এই প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি ইমতিয়াজ বলেন, ইলমার বাবা-মা মূল আসামির নাম এজাহারে উল্লেখই করেননি। এমনকি তদন্ত করার সময় ইলমার বাবা একেকবার একেকজনের নাম এজাহারভুক্ত করার আবদার নিয়ে এসেছেন। সন্তান হত্যার বিচার না চেয়ে তিনি বারবার আসামির নাম বদলানোর অনুরোধ নিয়ে পুলিশের কাছে আসেন। এ ছাড়া ইলমার সুরতহাল প্রতিবেদনে যেখানে যেখানে আঘাতের কথা বলা হয়েছে, মাসুম ঠিক সে জায়গাগুলোরই উল্লেখ করেছে। এর বাইরেও তারা নানা আলামত বিশ্নেষণ ও তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন।

সিআইডির তদন্ত সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, নরসিংদী থানার বাহেরচরে শাহজাহান ভূইয়া ও সাবেক মেম্বার বাচ্চুর নেতৃত্বে দুটি দলের মধ্যে এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে মাঝেমধ্যেই ঝামেলা হতো। শাহজাহান গ্রুপের সদস্য ও ইলমার ফুফাতো ভাই মাসুমের সঙ্গে বাচ্চু গ্রুপের সদস্য তোফাজ্জলের মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই মেয়েকে তুলে নিয়ে মাসুম তার ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি রেখেছিল। তোফাজ্জল দলবল নিয়ে মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। ওই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে মাসুম, তার ভাই খসরু ও ভাইয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে বাচ্চু গ্রুপের সদস্যদের ক্ষতি করতে শাহজাহানের অনুসারীরা ইলমাকে খুনের পরিকল্পনা করে।

সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা জানান, খুন ও পরিকল্পনায় জড়িত অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সুত্রঃ সমকাল

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.