সারাদেশ

মুক্তিযুদ্ধের নীরব সাক্ষী কুষ্টিয়ার করিমপুর

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম বাঙালী জাতির ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বর্বর পাক বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়ার এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে অতি বিরল। এ স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালীকে হারাতে হয়েছে ত্রিশ লাখ তাজা প্রাণ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রব আর অপরিমিত ধন সম্পদ। তবু এক বুক রক্তের বিনিময়ে বাঙালী পেয়েছে রক্তিম স্বাধীনতা। তাই বাংলার মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর নির্যাতিত ও পরাধীনতার গ্লানিতে দগ্ধ মুক্তিপাগল মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত হয়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের আবির্ভাব। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতি হিসেবে আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নোঙর ফেলতে পারিনি। এর অন্যতম মূল কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত মূল্যায়ন না হওয়া এবং দুর্নীতির কালো ছায়া। এখনও অনেক নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকা রয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের অবদান অসামান্য। খবরের অন্তরালে থাকা তেমনই এক জনপদ নিয়ে এই প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তৎকালীন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার রয়েছে গৌরবময় অবদান। মেহেরপুরের আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ১৯৭১ সালে কুষ্টিয়ার প্রত্যনত্ম গ্রামাঞ্চলের মানুষও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। তেমনি এক জনপদ ঐতিহ্যবাহী দুর্বাচারা। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এই গ্রামের যুবকরা দেশমাত্রিকার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, চার দশক পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের অমস্নান স্মৃতি বহনকারী এলাকাটি এখনও প্রচারের বাইরেই রয়ে গেছে! সরেজমিন এলাকা পরিদর্শন করে ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও প্রবীণদের কাছ থেকে জানা গেছে অনেক অজানা তথ্য। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কুষ্টিয়ার বংশীতলার যুদ্ধ ছিল অন্যতম। যুদ্ধস্থান হওয়ায় সবসময় বংশীতলা আলোচিত হয়েছে বেশি। কিন্তু এর পেছনে ছিল দুর্বাচারা অঞ্চলের যুবকদের অবিস্মরণীয় কীর্তি। মূলত ওই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ যোদ্ধাদের নিয়েই বংশীতলা যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেসময় বংশীতলা যুদ্ধের সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে দুর্বাচারা থেকে। ৫ সেপ্টেম্বর যুদ্ধের দিন পাক সেনারা বংশীতলা মোড়ে অবস্থান নিলে দুর্বাচারা থেকে পাল্টা আক্রমণে যান মুক্তিসেনারা। ওই যুদ্ধে সামগ্রিকভাবে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবুল কাশেম। তবে ৫ সেপ্টেম্বর সেখানে সামসুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এতে ১১ জন শহীদ হন এবং ২০/২৫ জন আহত হন। নিহতদের পাঁচজনকে দুর্বাচারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাফন করা হয় এবং বাকিদের বিভিন্ন জায়গায় বিৰিপ্তভাবে সমাহিত করা হয়। এরমধ্যে একজনকে কমলাপুর ফুটবল মাঠের পাশে দাফন করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বরের ওই যুদ্ধে ১১ জন শহীদ হলেও দুর্বাচারায় ছয়জনকে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়। তারা হলেন তাজুল ইসলাম, দিদার আলী (বীর প্রতীক), ইয়াকুব আলী, সাবান আলী, আব্দুল মান্নান ও শহিদুল ইসলাম। বাকিদের বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় দাফন করা হয়। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ার্স কলেজে ইলেকট্রিক্যাল তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। বর্তমানে যা রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। উজানগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম সলিম উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে শহীদুল ছিলেন অতি মেধাবী একজন ছাত্র। ওই সময়ে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীকলয় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নে পাড়ি জমান রাজশাহী। কিন্তু দেশমাতৃকার প্রয়োজনে কলম ছেড়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেন দেশপ্রেমের হাতিয়ার। ৬ ডিসেম্বর অকুতভয় এ বীর সনত্মান পাক হানাদারদের নৃশংসতার শিকার হন। বংশীতলা যুদ্ধে শহীদ হন দুর্বাচারার আরেক কৃতী সনত্মান তাজুল ইসলাম। তৎকালীন সময়ে অনার্স পড়ুয়া এ ছাত্র সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর হাতের হলুদ থাকা অবস্থাতেই ভারতে ট্রেনিংয়ে যান। সেখান থেকে এসে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শহীদ তাজুলের বাবা করিম শেখ বলেন, তাজুল ছিল পরোপকারী। অন্যের উপকার করাই যেন ওর নেশা ছিল। দুঃসাহসী তাজু বংশীতলা যুদ্ধে একাই শায়েসত্মা করেন এক পাক সেনাকে। ওর শক্তির কাছে হার মেনে শক্রুরা পেছন থেকে গুলি করে কাপুরুষের মতো ওকে হত্যা করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মহান স্মৃতি বহনকারী এ জায়গায় (দুর্বাচারা) যদি সরকারীভাবে কোন স্থাপনা করা হয় তাহলে জায়গাটি পরিণত হতে পারে ঐতিহাসিক স্থানে।

অনলাইন থেকে সংগ্রহীত।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.